বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
দেশীয় ফলের বৈচিত্র্যে পঞ্চগড়ে শুরু জাতীয় ফল মেলা ২০২৬ মাইকে ঘোষণা দিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, সড়কে মিলল হাত-পা বাঁধা মরদেহ বিরিয়ানির লোভে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, গ্রেপ্তার ২ রেকর্ড টানা ১৪ বার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে ব্রাজিল হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর ছাত্রদলের ‘হামলার’ প্রতিবাদ শিবিরের অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডের প্রশ্নে উত্তপ্ত সেই ভাইরাল ভিডিও, বাস্তবে কী ঘটেছিল? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একজন হারালেন চোখ, আরেকজনের মাথায় ৫ সেলাই সাংবাদিক হেনস্তার পর সাদুল্লাপুরের সেই এসিল্যান্ডকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তারের একদিন পর যুবলীগ নেতার মৃত্যু মসজিদের ভেতর থেকে ইমামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, কক্ষে মিললো চিরকুট
শয্যা নেই, যন্ত্র নষ্ট, দালালের রাজত্ব, হাসপাতালই এখন রোগশয্যায়

শয্যা নেই, যন্ত্র নষ্ট, দালালের রাজত্ব, হাসপাতালই এখন রোগশয্যায়

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো এখন নিজেরাই অসুস্থ। শয্যা নেই, যন্ত্রপাতি নষ্ট, জনবল সংকট, দালালের দৌরাত্ম্য-এসব ‘রোগে’ ধুঁকছে ঢাকার চারটি সরকারি হাসপাতাল। ঢাকা মেডিকেল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল (মিটফোর্ড), সোহরাওয়ার্দী ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালের চিত্র প্রায় একইরকম। ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগীর চাপ। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জীবন বাঁচানোর আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু রোগীরা এখানে এসে পড়ছেন নতুন সংকটে। তথ্য সূত্র দৈনিক যুগান্তর।

ঢাকা মেডিকেল:
ধারণক্ষমতার তিন গুণ রোগী, শয্যার জন্য হাহাকার—
আইসিইউ শয্যা দরকার। অপেক্ষা করতে হবে ৭ থেকে ১০ দিন। অপারেশন দরকার, সিরিয়াল পেতে লাগবে ৩ থেকে ৫ দিন। এমআরআই করাতে চান? একটা মেশিন পুরোপুরি নষ্ট। সচলটায় সিরিয়াল ১২০ জনের। পরীক্ষা হবে মাত্র ১৮ থেকে ২০ জনের। এই চিত্র দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। ২৬০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৭ থেকে ৮ হাজার রোগী। এর বাইরে আরও প্রায় ৫ হাজার রোগী আউটডোরে চিকিৎসা নেন। বেড নেই বলে চিকিৎসা চলছে ফ্লোরে, বারান্দায় এমনকি সিঁড়ির নিচেও। এর ওপর রয়েছে দালালচক্রের উৎপাত। তবে কর্তৃপক্ষ বলছেন জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কথা।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে শয্যা, জায়গা, জনবল, টেকনোলজিস্ট ও নার্সের সংকট রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট আরও বেশি। এছাড়াও পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রাংশের ঘাটতি আছে। ২৬০০ থেকে ৪০০০ শয্যায় উন্নতি করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একমত হয়েছিল। কিন্তু যে গতিতে কাজ আগানোর কথা, কেন জানি তা হচ্ছে না। অথচ শয্যা ঘাটতির কারণে আমাদের প্রতিদিন নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সেবা নিতে হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগে আসেন প্রায় ৫ হাজার রোগী। তাদের মধ্যে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসায় দিনে ভর্তি হন ২ হাজারের বেশি। সব মিলে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে সেবা নিচ্ছেন ৭ থেকে ৮ হাজার রোগী। তিনটি ইউনিটে আইসিইউ শয্যা মাত্র ৭৪টি। অথচ দিনে এই শয্যার চাহিদা কমপক্ষে ১৫০টির। সংকটের কারণে রোগীদের আইসিইউ শয্যা পেতে অপেক্ষা করতে হয় ৭ থেকে ১০ দিন। ডায়ালাইসিস শয্যার সংখ্যা ৩০। দিনে ৪ শিফটে ১২০ রোগীকে দেওয়া হয় ডায়ালাইসিস সেবা। দুটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে একটি পুরোপুরি নষ্ট। সচলটি দিয়ে দিনে ১৮-২০ রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। অথচ দিনে সিরিয়াল দিচ্ছেন ১২০ থেকে ১৩০ জন। এনআইসিইউ রয়েছে ৩৫টি, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় ছোট-বড় ৩ শতাধিক অপারেশন হয়। চিকিৎসক স্বল্পতা ও শয্যার অভাবে অপারেশনের রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় ৩ থেকে ৫ দিন। চারটি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে সক্রিয় ৩টি, যা দিয়ে দিনে ৩০০ রোগীকে সিটি স্ক্যান করানো হচ্ছে। এছাড়াও দিনে ১৪০০ রোগীর এক্স-রে এবং ৫০০ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করানো হচ্ছে। হাসপাতালের মেডিসিন, গাইনি, চর্ম, ইউরোলজি, মানসিক, ক্যানসার, ডেন্টাল, অর্থোপেডিক, নিউরোসার্জারি, শিশু সার্জারি ও ইএনটি বিভাগেও রোগীদের চাপ অনেক।

হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন ৩৫০০ জন। এর মধ্যে পদায়ন চিকিৎসক মাত্র ৮০০ জন। এছাড়া নার্স ২৫০০, টেকনোলজিস্ট ১৫০ এবং ওয়ার্ডবয় ও ক্লিনার রয়েছেন ৮০০ জন।

সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। ওয়ার্ডের ভেতরে নেই তিল ধারণের ঠাঁই। শয্যা না পেয়ে অনেকেই মেঝেতে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ সিরিয়াল নিয়ে আছেন আইসিইউ শয্যার আশায়। লম্বা লাইন দেখা যায় অপারেশন থিয়েটারের সামনেও। রোগী ও স্বজনরা জানান, হাসপাতালে সক্রিয় দালালচক্র। শয্যা বরাদ্দ, অপারেশন সিরিয়ালসহ নানা অজুহাতে তারা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফুসলিয়ে অনেককে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে।

পিরোজপুরের শাহ আলম বলেন, দুই দিন হলো মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছি। শয্যা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল দালালরা। কিন্তু টাকা দিইনি, তাই পাইনি। খিলক্ষেতের ইমরান হোসেন বলেন, ২৪ এপ্রিল বাবাকে ভর্তি করালেও শয্যা মেলেনি। ভর্তির তিন দিন পরও শয্যা পাননি নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রাজিব। ফলে অন্য শিশু রোগীর সঙ্গে শয্যা ভাগাভাগি করে থাকছেন তিনি। বলেন, গাদাগাদি করে থাকায় পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। মাদারীপুরের শিবচর থেকে আসা মিলন শিকদার বলেন, ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। সিরিয়াল দিয়ে সিটি স্ক্যান করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডাক্তার দেখাতে পারেনি।

সোহরাওয়ার্দী:
হাসপাতালের ভেতরে নিত্য পণ্যের হাট—

মূল ফটক থেকে জরুরি বিভাগের দূরত্ব মাত্র ৪০ সেকেন্ডের। কিন্তু মুমূর্ষু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি সেই পথ পেরোতে সময় নিল ৬ মিনিট। কারণ, প্রবেশপথ তখন ভাসমান দোকানের দখলে এবং মাইক্রোবাস ও অটোরিকশার ভিড়ে রাস্তা বন্ধ। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটক থেকে ভেতর পর্যন্ত এখন যেন একটি স্থায়ী বাজার-জুতা পালিশ থেকে শুরু করে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই মেলে এখানে। স্থানীয় ক্ষমতাশীলদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই অবৈধ ব্যবসায় মাসে আয় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরে সড়কের দুই পাশে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে কিছু অস্থায়ী দোকান। এছাড়া রয়েছে ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত রিকশা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভিড়। পরে আনসার সদস্যদের সহায়তায় মুমূর্ষু রোগীবাহী ওই অ্যাম্বুলেন্স জরুরি বিভাগে পৌঁছায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে এমন ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের। হাসপাতালটি যেন নিত্যপণ্যের হাটে পরিণত হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিরিয়ানি, আখের রস, লেবুর শরবত, ডাবের পানি বিক্রি করা হচ্ছে। লাইন ধরে ফুচকা, ঝালমুড়ি, ছোলা-পেঁয়াজু, বেলপুরি, সিদ্ধ ডিম, শিঙাড়া-সমুসা, বান, রুটি, কলা খাচ্ছে মানুষ। এছাড়াও বিক্রি হচ্ছে চা, কফি, পান, সুপারি, জর্দা, সিগারেট, দিয়াশলাই, ব্যাগ, মেয়েদের চুলের ফিতা, লেইস, থালা-বাটি, আয়না, চিরুনি, মাস্ক, একতারা-দোতারা ও বাঁশি। আছে ফ্লেক্সিলোড ও জুতা পালিশের দোকানও। হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ লোকসমাগমের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নিরপাত্তাহীনতায় ভুগছেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ডা. সেহাব উদ্দীন বলেন, ১৩৫০ শয্যার চিকিৎসাকেন্দ্রটিতে সেবা নিতে দৈনিক গড়ে ১০ হাজার রোগীর যাতায়াত। রোগীর সঙ্গে আসে প্রায় সমসংখ্যক অভিভাবক-স্বজন। জনসমাগম টার্গেট করে একটি মহল নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসছে। এতে সেবাদানের পরিবেশ বিঘ্ন হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কোনো সুরাহা মেলেনি।

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা জানান, বহির্বিভাগে দৈনিক গড়ে ৩,১৯৮ জন নতুন ও ২৪০৫ জন পুরোনো এবং ৯৩৯ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। নতুন রোগীদের মধ্যে গড়ে ৩২৩ জন ভর্তির সুযোগ পান। হাসপাতালটিতে গড়ে ৩,৩২০ রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া ২০টি আইসিইউ, ১০টি এইচডিইউ, ৫টি পিআইসিইউ ও ২৪টি এনআইসিইউ শয্যা রয়েছে। শয্যাগুলো সব সময় রোগীতে পূর্ণ থাকে। আইসিইউ শয্যা পেতে দৈনিক গড়ে ২০টি আবেদন জমা পড়ে।

এই রোগীদের চিকিৎসাসেবায় হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, ডেন্টাল সার্জনসহ ৩১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে আছেন ২৯৪ জন। নার্সের অনুমোদিত ৭৪৬ পদের বিপরীতে ৭৩৯ এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৪৯ পদের বিপরীতে আছেন ৪৮ জন। ৭টি অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) দৈনিক ইনডোরে ৫৫-৬০টি এবং আউটডোরে ২৫-৩০টি অস্ত্রোপচার হয়। একজন রোগীর অস্ত্রোপচারের সিরিয়াল পেতে গড়ে ২-৩ সপ্তাহ সময় লাগে।

নেফ্রোলজি বিভাগে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসে ৩১টি মেশিনের মধ্যে সচল ২৬টি। দৈনিক প্রতি শিফটে ২৫-৩০ জনের ডায়ালাইসিস হয়। ডায়ালাইসিসের সিরিয়াল পেতে ১৮০টি আবেদন জমা আছে। দীর্ঘ মেয়াদে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন-এমন রোগীকে ফিস্টুলা (এক ধরনের অস্ত্রোপচার) করতে হয়। কিন্তু হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের পাশের কিডনি ইনস্টিটিউট ও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মিঠুন কুমার সরকার বলেন, নবজাতকদের প্রায় ৫০ শতাংশের জন্ডিস ধরা পড়ে। যার জন্য ২০টি ফটোথেরাপি মেশিন দরকার হলেও আছে মাত্র ৬টি। নবজাতকদের স্যালাইন দেওয়ার জন্য প্রতিটি শয্যায় একটি করে সিরিঞ্জ পাম্প প্রয়োজন। আছে মাত্র ৮টি।

রেডিওলোজিস্ট মো. আক্কেল আলী বলেন, একসময় রোগীদের মাত্র ৩ হাজার টাকায় এমআরআই করা হতো। দৈনিক গড়ে ১৫ জন পরীক্ষাটি করতে পারতেন। কোভিডের পর এমআরআই মেশিন অকেজো হয়ে যায়। এছাড়া ২টি সিটিস্ক্যান মেশিনের একটি সচল, অন্যটা তিন বছর ধরে নষ্ট। দৈনিক গড়ে ৫০টি সিটি স্ক্যান সম্ভব হলেও মেশিন সংকটে রোগীদের পেটের সিটিস্ক্যানের জন্য গড়ে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ৪টি এক্সরে মেশিনে দৈনিক গড়ে ৫০০ এক্সরে হলেও মেশিনগুলো কোম্পানির হওয়ায় প্রায়ই এক্সরে ফিল্মের সংকট থাকে।

হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. আইনুল ইসলাম খান বলেন, শুধু হাসপাতালের আঙিনায় নয়, কলেজের আশপাশেও যত্রতত্র বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা হয়। চাইলেও কিছু করার থাকে না। রোগী ও স্বজনদের টার্গেট করেই একটি শক্তিশালী মহল বাণিজ্যে মেতে উঠেছে।

মিটফোর্ড:
দালালচক্রের খপ্পরে নাজেহাল রোগী—

রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজের ঢাল থেকে সাইরেন বাজাতে বাজাতে আসছিল অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু রাস্তার মুখে অর্ধশত অটোরিকশার জটে আটকে গেল। পাঁচ মিনিট পর যখন গেটে পৌঁছাল, ভেতরে অপেক্ষায় থাকা দালাল ততক্ষণে রোগীর স্বজনকে ঘিরে ধরেছে। পুরান ঢাকার লাখো মানুষের ভরসার প্রতিষ্ঠান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে এমন চিত্র প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, জনবল সংকট আর দালালের খপ্পরে নাজেহাল এ হাসপাতালের রোগীরা। আর এই সুযোগে আশপাশে গজিয়ে উঠেছে অন্তত অর্ধশত প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক; যেখানে রোগী বাগিয়ে নিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা। জানা যায়, হাসপাতালটিতে ৯০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এ কারণে বহু রোগীকে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই ২ হাজার শয্যায় উন্নীত করতে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বহির্বিভাগে দৈনিক ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এছাড়া জরুরি বিভাগে আসেন হাজারের বেশি।

সরেজমিন দেখা যায়, মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। অনেক রোগী মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বহির্বিভাগে সকাল ৯টা থেকে রোগী দেখা শুরু হলেও খুব ভোরে এসে অনেকে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছেন। আমিরুন্নেছা নামের এক বৃদ্ধা যুগান্তরকে বলেন, দুপুর ২টা পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। ভোরে এলে ডাক্তার দেখানো যায়। দেরিতে এলে সিরিয়ালেই দিনের অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। রোগীদের ভোগান্তি কমাতে চিকিৎসক আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রোগীর একাধিক স্বজন জানান, মিটফোর্ড হাসপাতাল ঘিরে বহু দালাল সক্রিয়। রোগী দেখলেই কাছে গিয়ে নানা প্রলোভনে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে যান তারা। এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বাইরে থেকে করিয়ে এনে দিচ্ছেন। সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৩০ দালালকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের চারটি পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলছে চিকিৎসাসেবা। এসব ভবনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আতঙ্কে থাকেন রোগীরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবনগুলো ভেঙে একই জায়গায় দুটি আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

মিটফোর্ডের নানা সংকটের সুযোগে আশপাশে অন্তত অর্ধশত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। স্থানীয় দোকানি ও রোগীদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো রোগী বাগিয়ে নেয়। এসব প্রাইভেট ক্লিনিকে কোনো ধরনের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসার নামে মানুষের পকেট কাটা হয়।

হাসপাতালের ২৭টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ২১ সচল এবং ৬টি নষ্ট। এসব মেশিনে দৈনিক ৪০-৪৫ জন রোগী ডায়ালাইসিস করাতে পারছেন। ১০০টির বেশি ডায়ালাইসিসের আবেদন সব সময় জমা থাকে। অন্যদিকে আইসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউতে আসা রোগীদের ৫০ ভাগ শয্যা পান; বাকিদের ফিরে যেতে হয়। জনবল স্বল্পতার কারণে বিকাল ও রাতে এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বন্ধ থাকে।

হাসপাতালটিতে ৩৭৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে চিকিৎসক আছেন ৩৫৯ জন। ক্রিটিক্যাল কেয়ার-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ২ জন। এছাড়া ৭৭৬টি পদের বিপরীতে নার্স আছেন ৬৩৮ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৪৩টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ৩৫ জন। হাসপাতালে সপ্তাহে ছোট-বড় ৪৫০ অপারেশন করা হচ্ছে। তবে অপারেশনের সিরিয়াল পেতে ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়।

টেস্ট করাতে চিকিৎসকও দেন প্রাইভেট হাসপাতালের টোকেন: হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ভালো থাকলেও টেস্টের জন্য বাইরে পাঠানো হচ্ছে। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা হালিমা বেগম যুগান্তরকে জানান, তার ভাইকে ৫টি টেস্ট দিয়ে বাইরে থেকে করিয়ে আনতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত প্রাইভেট হাসপাতালের নাম লেখা টোকেনও দিয়েছেন চিকিৎসক। একপ্রকার বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ দামে সেখানে গিয়ে টেস্ট করান তারা।

প্রবেশপথে যানজট : হাসপাতালে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোয় সব সময় যানজট লেগেই থাকে। একদিকে সরু রাস্তা, অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা, প্রাইভেট কারসহ নানা যানবাহনের চাপে হাসপাতালের ভেতরে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে যুদ্ধ করতে হয়। এছাড়া রাস্তার দুই পাশ দখল করে অবৈধভাবে ভাসমান দোকান গড়ে তোলায় আরও সরু হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম এ রুস্তম বলেন, হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সমস্যা জায়গাস্বল্পতা। কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চালু করা গেলে আরও রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এসব সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে সরকারের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদানে আধুনিক পদ্ধতি নেওয়াসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুগদা হাসপাতাল:
সেবা না পেয়ে ফিরে যান হাজারো রোগী—

ক্যাথল্যাব নেই, হৃদরোগী এলে তাই পাঠিয়ে দেওয়া হয় অন্য হাসপাতালে। নবজাতকের লাইফসাপোর্ট প্রয়োজন হলে কিংবা হাম রোগীর আইসিইউ দরকার হলেও একই পরিণতি-ছুটতে হয় অন্যত্র। নেই নিউরোসার্জারি বিভাগও। চিকিৎসাসেবার এমন ভয়াবহ সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাব্যবস্থা রীতিমতো ভেঙে পড়েছে। এছাড়া বাইরে সক্রিয় দালালচক্র। তারা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা।

জানা যায়, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে হাজারের বেশি রোগী প্রতিদিন ভর্তি থাকেন। এছাড়া দিনে প্রায় ৪০০০ রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন। সক্ষমতা না থাকায় প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। ২০১৫ সালে এখানে ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ রোগীর করোনারি এনজিওগ্রাম করা হতো। ২০২১ সালের অগ্নিকাণ্ডে এটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এতে হৃদরোগীদের জরুরি এনজিওগ্রাম সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এসব রোগীকে প্রাথমিক সেবা দিয়েই অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাম রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে, তবে আইসিইউ দরকার হলে তাকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখানে নবাগত শিশুর লাইফসাপোর্টের ব্যবস্থা নেই। তাই এমন রোগীকেও এখানে রাখা হয় না। হাসপাতালে নেই নিউরোসার্জারি বিভাগ। ফলে এ বিভাগের কোনো রোগী এলেও ফিরে যেতে হয়। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অনেক রোগ নির্ণয় পরীক্ষা বন্ধ থাকা এবং সিরিয়ালের ভোগান্তির কারণে বহু রোগী বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যায়।

পরপর দুদিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে রোগী অথবা তাদের স্বজনরা ভোর থেকে টিকিট সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়ান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্টারের দুপাশে নারী ও পুরুষের আলাদা লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে এসে এভাবে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ শেষে ডাক্তার দেখানোর ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন অনেকে।

কথা হয় রেজিয়া পারভীন নামের এক বৃদ্ধার সঙ্গে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। থাকেন সবুজবাগ এলাকার কালিবাড়ীতে। ভোরে হাসপাতালে এসেছেন কিন্তু সকাল ১০টার সময়ও তিনি লাইনেই দাঁড়িয়ে আছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

যাত্রাবাড়ী থেকে রশিদ উদ্দিন তার বাবাকে নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন। প্রবেশপথেই পড়েন দালালের খপ্পরে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পাওয়া অনেক কঠিন, লম্বা সিরিয়াল ইত্যাদি বলে তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা খসিয়ে নিল দালাল। রসিদও বুঝতে না পেরে টাকা দিয়ে দেন। বাস্তবে চিকিৎসার ব্যাপারে সেই দালালের কোনো ভূমিকাই ছিল না।

জানা গেছে, একাধিকবার অভিযান চালানোর পরও দালালদের দমন করা যায়নি। তারা এখন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকেন। সুযোগ পেলেই সহজ-সরল রোগীদের ভুল বুঝিয়ে পাশের কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক দলের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও আজকাল এই অপকর্মে যুক্ত হয়ে গেছে। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরের কিছু অসাধু লোকও একই কাজ করেন। মৌসুমি জ্বর নিয়ে আলমাস ও তার স্ত্রী ৪ দিন ধরে আলাদা ওয়ার্ডে ভর্তি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার বিষয়ে কিছুই বলা হয় না। দুপুর গড়াতেই যখন ল্যাব বন্ধ হয়ে যায় তখন দ্রুত পরীক্ষা করাতে বলা হয়। উপায় না পেয়ে তাদের (হাসপাতালের অসাধু লোক) বলে দেওয়া ডায়াগনস্টিকে যেতে বাধ্য হন তারা। এমন ঘটনা আরও অনেক রোগীর সঙ্গে ঘটেছে বলে জানা গেছে।

বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখানোর পর পরীক্ষা করাতে গেলে বেসরকারি চাকরিজীবী রাহুল আনন্দকে হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়-এলার্জি, ভিটামিন-ডি, হরমোন, লিপিড প্রোফাইল, ইউরিক অ্যাসিড, এক্স-রেসহ আরও বেশকিছু পরীক্ষা বহির্বিভাগের রোগীদের করা হয় না। রাহুলের ভাষ্য, অনেক সময় দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব পরীক্ষা করা হয় না।

অসঙ্গতির এখানেই শেষ নয়, হাসপাতালের অদূরে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ময়লার ভাগাড়। বর্ষা ছাড়া বছরের বাকি সময়টাতেও জলাবদ্ধ ও অপরিচ্ছন্ন থাকে হাসপাতালটির প্রবেশপথ। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ করে ওয়ার্ডের পাশে টয়লেটের অবস্থা খুবই নাজুক।

এসব বিষয়ে মুগদা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, দালালদের উৎপাত আছে। তবে আগের তুলনায় কমেছে। আমরা যদি সব রোগের পরীক্ষা করাতে পারতাম তাহলে দালালরা সুযোগ নিতে পারত না। আমাদের বাজেট কম, তাই কিছু টেস্টের জন্য রোগীদের বাইরে যেতেই হয়। তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ক্যাথল্যাব দ্রুত পেয়ে যাব। লিফটের জন্য রোগীদের ভোগান্তি হয়। সেখানে নতুন চারটি লিফট যুক্ত করা হবে। এছাড়া মুগদা হাসপাতালকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com